দুর্গাপুজোর ইতিহাস আসলে বাংলার সামাজিক ইতিহাসেরই আয়না। যে উৎসব একদিন ছিল জমিদারবাড়ির ঠাকুরদালানে সীমাবদ্ধ অভিজাত আয়োজন, আজ তা কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় কোটি মানুষের সর্বজনীন উৎসব — ২০২১ সালে ইউনেস্কোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া বিশ্বের অন্যতম বড় উন্মুক্ত শিল্পোৎসব।
দুর্গাপুজোর ইতিহাস: শুরুটা কোথায়?
শারদীয় দুর্গাপুজো বাংলায় ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। লোককথা অনুযায়ী দিনাজপুর ও মালদার জমিদাররা বাংলায় প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। ডিএনএ-র প্রতিবেদন
১৭৫৭: শোভাবাজার রাজবাড়ি ও ‘কোম্পানির পুজো’
পলাশীর যুদ্ধের (২৩ জুন, ১৭৫৭) কয়েক মাস পর রাজা নবকৃষ্ণ দেব শোভাবাজার রাজবাড়িতে ধুমধাম করে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। কথিত আছে, রবার্ট ক্লাইভকে নবকৃষ্ণ দেব নিজের বাড়িতে দেবী দুর্গার পুজোয় আমন্ত্রণ জানান। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতির কারণে স্থানীয়রা এই পুজোকে ‘কোম্পানির পুজো’ বলতে শুরু করেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন
শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো আজও বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য বহন করে: ঠাকুরদালানে পুজো হয়, সিংহের মুখ ঘোড়ার মতো — ‘ঘোটকমুখী সিংহ’ — এবং বিসর্জনের জন্য প্রতিমা নৌকায় করে হুগলি নদীতে নিয়ে যাওয়া হয়। ট্র্যাভেল অ্যান্ড লেজার এশিয়া
বারোয়ারির জন্ম: গুপ্তিপাড়ার বারো বন্ধু, ১৭৯০
১৭৯০ সালে বারোজন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে সর্বসাধারণের জন্য দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন — ‘বারো’ ও ‘ইয়ার’ মিলেই ‘বারোয়ারি’ শব্দের জন্ম। একটি সতর্কতা জরুরি: প্রথম বারোয়ারি পুজোর সাল নিয়ে সূত্রে ভিন্নমত আছে — কোনও কোনও সূত্রে ১৭৬১ সালের কথাও বলা হয়। তবে ১৭৯০ সালই সর্বাধিক প্রচলিত তারিখ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত পিটিআই প্রতিবেদন
কলকাতায় সার্বজনীন পুজোর আগমন: ১৯১০
১৯১০ সালে ভবানীপুরের সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা বলরাম বসু ঘাট রোডে কলকাতার প্রথম সত্যিকারের কমিউনিটি দুর্গাপুজোর আয়োজন করে। কলকাতা দুর্গোৎসব
পাড়ার পুজো থেকে থিম-পুজো: বিংশ শতকের রূপান্তর
স্বাধীনতার পর সার্বজনীন পুজোই দুর্গাপুজোর প্রধান রূপ হয়ে দাঁড়ায়। আশির দশক থেকে প্যান্ডেল-শিল্পে থিমের যুগ শুরু হয়। এই উৎসবকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি মরসুমি অর্থনীতিও — প্রতিমা নির্মাতা, প্যান্ডেল-শ্রমিক, ঢাকি থেকে ফুচকা-বিক্রেতা — হাজারো পরিবারের রুটি-রুজি জড়িয়ে আছে এই পাঁচ দিনের সঙ্গে।
২০২১: ইউনেস্কোর বিশ্বস্বীকৃতি
২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর আন্তঃসরকারি কমিটির ১৬তম অধিবেশনে “কলকাতার দুর্গাপুজো” মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ইউনেস্কোর অফিসিয়াল পাতা দ্য ইকোনমিক টাইমস
চার শতক পরেও: ঐতিহ্য আর উৎসবের মেলবন্ধন
১৬০৬ সালের লোককথা থেকে ১৭৫৭-র রাজবাড়ি, ১৭৯০-এর বারোয়ারি থেকে ১৯১০-এর সার্বজনীন, আর সেখান থেকে ২০২১-এর ইউনেস্কো স্বীকৃতি — দুর্গাপুজোর ইতিহাস আসলে ক্ষমতা থেকে জনতার হাতে উৎসবের হস্তান্তরের ইতিহাস।
এই ইতিহাসের জীবন্ত রূপ দেখতে চাইলে ঘুরে আসুন কলকাতার বিখ্যাত পুজোগুলি: ২০২৬ সালের প্যান্ডেল হপিং গাইড।

