দুর্গাপুজো ২০২৬: কলকাতায় প্যান্ডেল হপিংয়ের সম্পূর্ণ গাইড

২০১৭ সালে কলকাতার ত্রিধারা সম্মিলনীর দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল

Written by

in

দুর্গাপুজো ২০২৬ কলকাতায় আসছে অক্টোবরের মাঝামাঝি। মহালয়া পড়েছে ১০ অক্টোবর, শনিবার, আর মূল পুজোর পাঁচ দিন — ষষ্ঠী থেকে দশমী — চলবে ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। এই ক’দিন কলকাতা কার্যত একটি উন্মুক্ত শিল্পগ্যালারিতে পরিণত হয়: পাড়ায় পাড়ায় থিমের প্যান্ডেল, আলোর সাজ, ঢাকের বাদ্য আর লাখো মানুষের ভিড়। ২০২১ সালে ইউনেস্কো “কলকাতার দুর্গাপুজো”কে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকে এই উৎসবের আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বেড়েছে। এই গাইডে রইল যাচাই করা তারিখের তালিকা, এলাকাভিত্তিক বিখ্যাত পুজো, প্যান্ডেল হপিংয়ের ব্যবহারিক পরামর্শ এবং ভিড়ের মধ্যে নিরাপত্তার নির্দেশিকা।

দুর্গাপুজো ২০২৬ কলকাতা: মহালয়া থেকে দশমীর তারিখের তালিকা

২০২৬ সালের পঞ্জিকা অনুযায়ী দুর্গাপুজোর প্রধান তিথিগুলি নিচে দেওয়া হল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তারিখ যাচাই করে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

তিথিতারিখবারবিশেষত্ব
মহালয়া১০ অক্টোবর ২০২৬শনিবারপিতৃপক্ষের সমাপ্তি, দেবীপক্ষের সূচনা; ভোরে মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচার
মহাপঞ্চমী১৫ অক্টোবর ২০২৬বৃহস্পতিবারঅনেক প্যান্ডেলের উদ্বোধন ও দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া
মহাষষ্ঠী১৬ অক্টোবর ২০২৬শুক্রবারবোধন — দেবীর আবাহন; মূল উৎসবের সূচনা
মহাসপ্তমী১৭ অক্টোবর ২০২৬শনিবারনবপত্রিকা স্নান, কলা বউ স্নান
মহাষ্টমী১৮ অক্টোবর ২০২৬রবিবারপুষ্পাঞ্জলি, কুমারী পুজো, সন্ধিপুজো (অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে)
মহানবমী১৯ অক্টোবর ২০২৬সোমবারহোম-যজ্ঞ; শেষ পূর্ণাঙ্গ প্যান্ডেল-রাত্রি
বিজয়া দশমী২০ অক্টোবর ২০২৬মঙ্গলবারসিঁদুরখেলা, বিসর্জন, বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়

মহালয়ার দিনটি নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই: এবছর সর্বপিতৃ অমাবস্যা পড়েছে ১০ অক্টোবর, শনিবার — অমাবস্যা তিথি শুরু ৯ অক্টোবর রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে, শেষ ১০ অক্টোবর রাত ৯টা ১৯ মিনিটে, ফলে দিনের বেলার পুরো সময়টাতেই তিথি থাকছে বলে এবিপি লাইভ জানিয়েছে। ভোর ৪টেয় আকাশবাণীতে প্রচারিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠান — ১৯৩১ সাল থেকে চলে আসা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ, যা এখন আকাশবাণীর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলেও শোনা যায়।

একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: তিথি ও স্থানীয় পঞ্জিকার হিসেবে দশমীর বিসর্জন কিছু জায়গায় ২১ অক্টোবর পর্যন্ত গড়াতে পারে। তাই নিজের পাড়া বা গন্তব্য পুজোর বিসর্জনের সময়সূচি স্থানীয় ঘোষণা থেকে যাচাই করে নেওয়াই ভালো।

উত্তর কলকাতা: ঐতিহ্য ও বনেদি পুজোর ঠিকানা

উত্তর কলকাতা দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যবাহী মুখ। এখানকার পুজোগুলিতে থিমের চমকের চেয়ে ঐতিহ্য, প্রতিমার কারুকার্য ও পারিবারিক আবহই প্রধান আকর্ষণ।

  • বাগবাজার সার্বজনীন: শতাব্দীপ্রাচীন এই পুজো তার ধ্রুপদী একচালা দুর্গাপ্রতিমা ও ঐতিহ্যবাহী আবহের জন্য বিখ্যাত। প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি মাঠের মেলা ও দোকানপাট এখানকার বাড়তি আকর্ষণ।
  • শোভাবাজার রাজবাড়ি: ১৭৫৭ সাল থেকে চলে আসা বনেদি বাড়ির পুজো — রাজা নবকৃষ্ণ দেবের প্রতিষ্ঠিত এই পুজোই কলকাতার প্রাচীনতম ধারাবাহিক পারিবারিক পুজোগুলির একটি। এই পুজোর দীর্ঘ ইতিহাস জানতে পড়ুন: বনেদি বাড়ির পুজোর ৪০০ বছরের ইতিহাস।
  • কুমারটুলি পার্ক ও আহিরীটোলা সার্বজনীন: কুমারটুলি — প্রতিমা তৈরির বিখ্যাত পাড়া — সংলগ্ন এই পুজোগুলিতে শিল্পীদের সৃষ্টিশীলতার ছাপ স্পষ্ট। এবিপি লাইভের প্রতিবেদন

মধ্য কলকাতা: আলো ও স্থাপত্যের জাঁকজমক

  • কলেজ স্কোয়ার: জলাশয়ের মাঝখানে প্যান্ডেল ও চারপাশে আলোর প্রতিফলন — রাতের বেলায় এই দৃশ্য কলকাতার পুজোর সবচেয়ে চেনা ছবিগুলির একটি।
  • সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার (লেবুতলা): বিশাল স্থাপত্যশৈলীর প্রতিরূপ ও জমকালো আলোকসজ্জার জন্য পরিচিত।
  • মহম্মদ আলি পার্ক: মধ্য কলকাতার আরেকটি জনপ্রিয় বড় পুজো, থিম-প্যান্ডেলের জন্য পরিচিত।

দক্ষিণ কলকাতা: থিম-পুজোর রাজধানী

  • একডালিয়া এভারগ্রিন: বিশ্বখ্যাত স্থাপত্যের অনুকরণে প্যান্ডেল ও ঐতিহ্যবাহী আলোকসজ্জার জন্য সুপরিচিত।
  • সিংহি পার্ক সার্বজনীন: দক্ষিণের অন্যতম ‘মাস্ট-ভিজিট’ পুজো।
  • বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন: শিল্প, সমাজ ও ঐতিহ্যভিত্তিক থিমের জন্য পরিচিত।
  • ম্যাডক্স স্কোয়ার: খোলা মাঠে কার্নিভালের আমেজ — তরুণদের আড্ডার প্রিয় ঠিকানা।
  • সুরুচি সংঘ: ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে থিমে তুলে ধরার জন্য পরিচিত।

কোন দিন কোথায়: দিনভিত্তিক রূপরেখা

  • পঞ্চমী–ষষ্ঠী (১৫–১৬ অক্টোবর): অনেক প্যান্ডেলের উদ্বোধন হয়; বড় পুজোগুলির সামনে ভিড় তুলনামূলক কম থাকে।
  • সপ্তমী (১৭ অক্টোবর): দিনের বেলায় উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী পুজো ঘোরার ভালো সময়।
  • অষ্টমী (১৮ অক্টোবর): সকালে পুষ্পাঞ্জলি ও কুমারী পুজো; সন্ধ্যায় সন্ধিপুজোর জন্য ভিড় বাড়ে।
  • নবমী (১৯ অক্টোবর): শেষ পূর্ণাঙ্গ প্যান্ডেল-রাত্রি — ভিড়ও সর্বাধিক।
  • দশমী (২০ অক্টোবর): সিঁদুরখেলা ও বিসর্জনের শোভাযাত্রা।

প্যান্ডেল হপিংয়ের ব্যবহারিক টিপস

  • শহরকে জোনে ভাগ করুন: একদিন উত্তর, একদিন মধ্য ও দক্ষিণ — এভাবে ঘোরার পরামর্শ দেন অভিজ্ঞ প্যান্ডেল-হপাররা।
  • সময় বাছুন বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে: সপ্তমী থেকে নবমীর সন্ধ্যায় বড় পুজোগুলির সামনে লম্বা লাইন পড়ে; ভিড় এড়াতে দিনের বেলা বা ভোরে প্যান্ডেল দেখুন।
  • মেট্রোকে বন্ধু করুন: শোভাবাজার, গিরিশ পার্ক, চাঁদনি চক, কালীঘাট, রবীন্দ্র সরোবর — মেট্রো স্টেশনগুলির কাছেই বহু বিখ্যাত পুজো।
  • খাওয়া-দাওয়া: প্যান্ডেলের ভোগ, কাঠি রোল, ফুচকা আর মিষ্টি দই — তালিকা আগে থেকে ঠিক করে রাখলে সময় বাঁচে।
  • জল ও বিশ্রাম: লম্বা হাঁটার রুটে সঙ্গে জলের বোতল রাখুন।

ভিড় ও নিরাপত্তা: যা মনে রাখবেন

  • দলবেঁধে চলুন; ভিড়ের মধ্যে শিশুদের হাত ধরে রাখুন।
  • মূল্যবান জিনিসপত্র সামলে রাখুন।
  • পুলিশের ব্যারিকেড ও স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশ মেনে চলুন।
  • জরুরি প্রয়োজনে পুলিশের হেল্পলাইন নম্বর মোবাইলে সেভ করে রাখুন।

দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয় — কলকাতার কাছে এটি শিল্প, সমাজ ও অর্থনীতির মহোৎসব। শুভ শারদীয়া!

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *