ব্যথার ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে দেশজুড়ে সতর্কবার্তা জারি করল কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিডিএসসিও। সংস্থার দাবি, এই ওষুধগুলোর অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে কিডনির গুরুতর ক্ষতি, এমনকি ক্রনিক কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
সিডিএসসিও-র সতর্কবার্তায় কী বলা হয়েছে
ড্রাগস কন্ট্রোলার জেনারেল (ভারত) ডা. রাজীব সিং রঘুবংশীর স্বাক্ষরিত সার্কুলারে (২১ সেপ্টেম্বর) সাধারণ মানুষ, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, ওষুধ বিক্রেতা, পাইকারি ব্যবসায়ী, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান — সবার প্রতি এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (এনএসএআইডি) — অর্থাৎ সাধারণ ব্যথার ওষুধ — এবং অ্যান্টিবায়োটিক কেবল চিকিৎসাগত প্রয়োজনে, সঠিক মাত্রায় ও সঠিক সময়ের জন্য, রেজিস্টার্ড মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনারের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করতে হবে।
সাধারণ মানুষের জন্য নির্দেশ
যাঁদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা বা কিডনি-সংক্রান্ত ঝুঁকি রয়েছে, তাঁরা এনএসএআইডি নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ব্যথা বা জ্বর বারবার ফিরে এলে বারবার ব্যথার ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
সাধারণ সর্দি-কাশির মতো ভাইরাল সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না — অপ্রয়োজনে খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বাড়ে।
চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স পুরো শেষ করুন; নিজের ওষুধ অন্যকে দেবেন না।
শিডিউল-এইচ ও এইচ১: আইন কী বলে
ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিকস অ্যাক্ট, ১৯৪০ এবং ড্রাগস রুলস, ১৯৪৫ অনুযায়ী বেশিরভাগ এনএসএআইডি শিডিউল-এইচ-এর অন্তর্গত — অর্থাৎ রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া খুচরো বিক্রি করা যাবে না। বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিক শিডিউল-এইচ১-এর আওতায়, যেগুলোর গায়ে সতর্কবার্তা থাকে যে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া বিপজ্জনক।
চিকিৎসকদের প্রতি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপের নীতি মেনে দায়িত্বশীলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক লেখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মাথা ধরলেই ব্যথার ওষুধ, জ্বর এলেই অ্যান্টিবায়োটিক — এই অভ্যাস প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই আছে। কিন্তু বারবার ব্যথার ওষুধ খাওয়ার এই সহজ অভ্যাস কিডনির ক্ষতি ডেকে আনতে পারে বলে সম্প্রতি সতর্ক করেছে সিডিএসসিও। কেন এমন হয়? আসুন ধাপে ধাপে বুঝে নিই।
বেশিরভাগ সাধারণ ব্যথার ওষুধ নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস বা এনএসএআইডি গোত্রের। এগুলো শরীরে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামে একটি রাসায়নিকের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনই ব্যথা ও প্রদাহের অনুভূতি তৈরি করে, তাই এর উৎপাদন কমলে ব্যথা কমে।
সমস্যা হলো, এই একই রাসায়নিক শরীরের আরও অনেক কাজে লাগে — তার মধ্যে অন্যতম হলো কিডনিতে রক্তপ্রবাহ বজায় রাখা।
কিডনির ক্ষতি হয় কীভাবে
কিডনির কাজ হলো রক্ত ছেঁকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়া। এই ছাঁকনির কাজ নির্ভর করে কিডনিতে পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহের ওপর। এনএসএআইডি প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন কমিয়ে দেওয়ায় কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমে যায়।
ওষুধটি বারবার বা দীর্ঘদিন খেলে এই প্রভাব জমতে থাকে। ফলে কিডনির ছাঁকনির কাজ ব্যাহত হয়। শরীরে জলের ঘাটতি থাকলে — যেমন ডায়রিয়া, বমি বা প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত ঘাম হলে — এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এ থেকে অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি, এমনকি ক্রনিক কিডনি রোগ পর্যন্ত হতে পারে। সিডিএসসিও-র সতর্কবার্তায় এই ঝুঁকির কথাই তুলে ধরা হয়েছে।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
সবার ঝুঁকি সমান নয়। নিচের দলগুলোর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি:
যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ আছে
বয়স্ক ব্যক্তি
যাঁদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা রয়েছে
যাঁরা ইতিমধ্যে মূত্রবর্ধক বা রক্তচাপের ওষুধ খান
এই কারণেই সিডিএসসিও বিশেষভাবে বলেছে, কিডনি-সংক্রান্ত ঝুঁকি থাকলে এনএসএআইডি নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেই হবে।
কিডনির ক্ষতির সতর্ক সংকেত
শুরুর দিকে কিডনির ক্ষতির লক্ষণ স্পষ্ট নাও হতে পারে। তবে এই সংকেতগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিক কমে যাওয়া
পা বা মুখ ফুলে যাওয়া
অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা
বমি বমি ভাব বা খিদে কমে যাওয়া
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও রেজিস্ট্যান্স
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া মারে, ভাইরাস নয়। সাধারণ সর্দি-কাশি বেশিরভাগই ভাইরাল — সেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো কাজ নেই, শুধু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়।
আরও বড় বিপদ হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। ফলে ভবিষ্যতে সত্যিকারের সংক্রমণ হলে সেই ওষুধ আর কাজ করে না। এ কারণেই সিডিএসসিও চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক লেখার আহ্বান জানিয়েছে।
শিডিউল-এইচ বনাম শিডিউল-এইচ১
ড্রাগস রুলস, ১৯৪৫ অনুযায়ী ওষুধগুলোকে ঝুঁকি অনুযায়ী বিভিন্ন শিডিউলে ভাগ করা হয়েছে:
শিডিউল
কোন ওষুধ
নিয়ম
শিডিউল-এইচ
বেশিরভাগ এনএসএআইডি (ব্যথার ওষুধ)
রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া খুচরো বিক্রি নয়
শিডিউল-এইচ১
বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিক
প্রেসক্রিপশন বাধ্যতামূলক; প্যাকেটে সতর্কবার্তা; বিক্রির হিসাব রাখতে হয়
শিডিউল-জি / এক্স
অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ
চিকিৎসা তত্ত্বাবধানে ব্যবহার
অর্থাৎ, এই ওষুধগুলো আদতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রির কথা নয় — সিডিএসসিও-র সার্কুলার সেই নিয়মই আবার মনে করিয়ে দিয়েছে।
নিরাপদে ওষুধ খাওয়ার নিয়ম
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বারবার ব্যথার ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না।
ব্যথা বা জ্বর ফিরে এলে নিজে ওষুধের মাত্রা না বাড়িয়ে ডাক্তার দেখান।
অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স ডাক্তার যেভাবে বলেছেন, ঠিক সেভাবেই শেষ করুন।
অন্যের ওষুধ নিজে খাবেন না, নিজের ওষুধ অন্যকে দেবেন না।
কিডনির সমস্যা থাকলে যে কোনো ব্যথার ওষুধ নেওয়ার আগে চিকিৎসককে জানান।
পর্যাপ্ত জল পান করুন, বিশেষ করে ওষুধ চলাকালীন।
মনে রাখবেন: নির্ধারিত ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
মাঝে মাঝে একটা ব্যথার ওষুধ খেলে কি কিডনি নষ্ট হবে?
না। মাঝে মাঝে নির্দেশিত মাত্রায় খেলে সাধারণত ঝুঁকি কম। বিপদ হলো বারবার, দীর্ঘমেয়াদি বা অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়ায়।
জ্বর হলে কী করব?
জ্বর বারবার ফিরলে বা তিন দিনের বেশি থাকলে চিকিৎসক দেখান। নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না।
পুরনো প্রেসক্রিপশনের অ্যান্টিবায়োটিক আবার খাওয়া যাবে?
না। প্রতিটি সংক্রমণ আলাদা; পুরনো ওষুধ নতুন রোগে কাজ নাও করতে পারে, উল্টে রেজিস্ট্যান্স বাড়াতে পারে।
কিডনি ঠিক আছে কিনা কীভাবে বুঝব?
রক্তে ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষাসহ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাই ভরসা। সন্দেহ হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয় — কোনো সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
বর্ষা শেষ, কিন্তু মশার মরশুম শেষ হয়নি। বর্ষা-পরবর্তী সময়ে জমা জলে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ে, আর সেই সঙ্গে বাড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ।
ডেঙ্গুর লক্ষণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
হঠাৎ উচ্চ জ্বর
তীব্র মাথাব্যথা
চোখের পেছনে ব্যথা
পেশি ও গাঁটে ব্যথা
বমি বমি ভাব ও বমি
গায়ে র্যাশ
জ্বর কমার পরই সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর ৪ থেকে ৬ নম্বর দিন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই সময় জ্বর কমে গেলেও শরীরে প্লাজমা লিকেজ, রক্তক্ষরণ বা শকের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সতর্ক সংকেত: কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন
পেটে তীব্র ব্যথা
বারবার বমি
নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত
অস্বাভাবিক ক্লান্তি, অস্থিরতা
চিকিৎসায় কী করা হয়
ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই — চিকিৎসা মূলত সহায়ক। WHO-এর পরামর্শ: পর্যাপ্ত তরল পান, বিশ্রাম এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল। অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেন এড়িয়ে চলুন।
ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা অনেক সময় নীরবে বাড়তে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে লক্ষণগুলো হালকা হতে পারে এবং বহু বছর ধরে নজরে নাও আসতে পারে। অথচ সময়মতো ধরা পড়লে বড় জটিলতা এড়ানো যায়।
ডায়াবেটিস কী
শরীর যখন রক্তে গ্লুকোজ ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন ডায়াবেটিস হয়। ইনসুলিন নামে হরমোন রক্ত থেকে গ্লুকোজ কোষে পৌঁছে দেয়; তা কার্যকর না হলে রক্তে শর্করা বেড়ে যায়।
শুরুর ৫টি লক্ষণ
অস্বাভাবিক তৃষ্ণা — বারবার জল খেয়েও তৃষ্ণা না মেটা।
বারবার প্রস্রাব — বিশেষ করে রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া।