ব্যাখ্যা: কেন বারবার ব্যথার ওষুধ খাওয়া কিডনির জন্য বিপজ্জনক

কিডনির নেফ্রনের চিত্র — ব্যথার ওষুধে কিডনির ক্ষতি কীভাবে হয়

Written by

in

নয়াদিল্লি, ৩০ সেপ্টেম্বর

মাথা ধরলেই ব্যথার ওষুধ, জ্বর এলেই অ্যান্টিবায়োটিক — এই অভ্যাস প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই আছে। কিন্তু বারবার ব্যথার ওষুধ খাওয়ার এই সহজ অভ্যাস কিডনির ক্ষতি ডেকে আনতে পারে বলে সম্প্রতি সতর্ক করেছে সিডিএসসিও। কেন এমন হয়? আসুন ধাপে ধাপে বুঝে নিই।

সম্পর্কিত খবর: সিডিএসসিও-র সতর্কবার্তা: ব্যথার ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিকে কিডনির ক্ষতির আশঙ্কা

এই লেখায়

  • ব্যথার ওষুধ (এনএসএআইডি) কীভাবে কাজ করে
  • কিডনির ক্ষতি হয় কীভাবে
  • কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
  • কিডনির ক্ষতির সতর্ক সংকেত
  • অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও রেজিস্ট্যান্স
  • শিডিউল-এইচ বনাম শিডিউল-এইচ১
  • নিরাপদে ওষুধ খাওয়ার নিয়ম
  • প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ব্যথার ওষুধ (এনএসএআইডি) কীভাবে কাজ করে

বেশিরভাগ সাধারণ ব্যথার ওষুধ নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস বা এনএসএআইডি গোত্রের। এগুলো শরীরে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামে একটি রাসায়নিকের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনই ব্যথা ও প্রদাহের অনুভূতি তৈরি করে, তাই এর উৎপাদন কমলে ব্যথা কমে।

সমস্যা হলো, এই একই রাসায়নিক শরীরের আরও অনেক কাজে লাগে — তার মধ্যে অন্যতম হলো কিডনিতে রক্তপ্রবাহ বজায় রাখা।

কিডনির ক্ষতি হয় কীভাবে

কিডনির কাজ হলো রক্ত ছেঁকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়া। এই ছাঁকনির কাজ নির্ভর করে কিডনিতে পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহের ওপর। এনএসএআইডি প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন কমিয়ে দেওয়ায় কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমে যায়।

ওষুধটি বারবার বা দীর্ঘদিন খেলে এই প্রভাব জমতে থাকে। ফলে কিডনির ছাঁকনির কাজ ব্যাহত হয়। শরীরে জলের ঘাটতি থাকলে — যেমন ডায়রিয়া, বমি বা প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত ঘাম হলে — এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এ থেকে অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি, এমনকি ক্রনিক কিডনি রোগ পর্যন্ত হতে পারে। সিডিএসসিও-র সতর্কবার্তায় এই ঝুঁকির কথাই তুলে ধরা হয়েছে।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

সবার ঝুঁকি সমান নয়। নিচের দলগুলোর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি:

  • যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ আছে
  • বয়স্ক ব্যক্তি
  • যাঁদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা রয়েছে
  • যাঁরা ইতিমধ্যে মূত্রবর্ধক বা রক্তচাপের ওষুধ খান

এই কারণেই সিডিএসসিও বিশেষভাবে বলেছে, কিডনি-সংক্রান্ত ঝুঁকি থাকলে এনএসএআইডি নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেই হবে।

কিডনির ক্ষতির সতর্ক সংকেত

শুরুর দিকে কিডনির ক্ষতির লক্ষণ স্পষ্ট নাও হতে পারে। তবে এই সংকেতগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:

  • প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিক কমে যাওয়া
  • পা বা মুখ ফুলে যাওয়া
  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা
  • বমি বমি ভাব বা খিদে কমে যাওয়া

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও রেজিস্ট্যান্স

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া মারে, ভাইরাস নয়। সাধারণ সর্দি-কাশি বেশিরভাগই ভাইরাল — সেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো কাজ নেই, শুধু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়।

আরও বড় বিপদ হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। ফলে ভবিষ্যতে সত্যিকারের সংক্রমণ হলে সেই ওষুধ আর কাজ করে না। এ কারণেই সিডিএসসিও চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক লেখার আহ্বান জানিয়েছে।

শিডিউল-এইচ বনাম শিডিউল-এইচ১

ড্রাগস রুলস, ১৯৪৫ অনুযায়ী ওষুধগুলোকে ঝুঁকি অনুযায়ী বিভিন্ন শিডিউলে ভাগ করা হয়েছে:

শিডিউলকোন ওষুধনিয়ম
শিডিউল-এইচবেশিরভাগ এনএসএআইডি (ব্যথার ওষুধ)রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া খুচরো বিক্রি নয়
শিডিউল-এইচ১বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিকপ্রেসক্রিপশন বাধ্যতামূলক; প্যাকেটে সতর্কবার্তা; বিক্রির হিসাব রাখতে হয়
শিডিউল-জি / এক্সঅন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধচিকিৎসা তত্ত্বাবধানে ব্যবহার

অর্থাৎ, এই ওষুধগুলো আদতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রির কথা নয় — সিডিএসসিও-র সার্কুলার সেই নিয়মই আবার মনে করিয়ে দিয়েছে।

নিরাপদে ওষুধ খাওয়ার নিয়ম

  1. চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বারবার ব্যথার ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না।
  2. ব্যথা বা জ্বর ফিরে এলে নিজে ওষুধের মাত্রা না বাড়িয়ে ডাক্তার দেখান।
  3. অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স ডাক্তার যেভাবে বলেছেন, ঠিক সেভাবেই শেষ করুন।
  4. অন্যের ওষুধ নিজে খাবেন না, নিজের ওষুধ অন্যকে দেবেন না।
  5. কিডনির সমস্যা থাকলে যে কোনো ব্যথার ওষুধ নেওয়ার আগে চিকিৎসককে জানান।
  6. পর্যাপ্ত জল পান করুন, বিশেষ করে ওষুধ চলাকালীন।

মনে রাখবেন: নির্ধারিত ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মাঝে মাঝে একটা ব্যথার ওষুধ খেলে কি কিডনি নষ্ট হবে?

না। মাঝে মাঝে নির্দেশিত মাত্রায় খেলে সাধারণত ঝুঁকি কম। বিপদ হলো বারবার, দীর্ঘমেয়াদি বা অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়ায়।

জ্বর হলে কী করব?

জ্বর বারবার ফিরলে বা তিন দিনের বেশি থাকলে চিকিৎসক দেখান। নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না।

পুরনো প্রেসক্রিপশনের অ্যান্টিবায়োটিক আবার খাওয়া যাবে?

না। প্রতিটি সংক্রমণ আলাদা; পুরনো ওষুধ নতুন রোগে কাজ নাও করতে পারে, উল্টে রেজিস্ট্যান্স বাড়াতে পারে।

কিডনি ঠিক আছে কিনা কীভাবে বুঝব?

রক্তে ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষাসহ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাই ভরসা। সন্দেহ হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয় — কোনো সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

সূত্র: সিডিএসসিও সার্কুলার (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) (ফার্মাটিউটর); টেজবাজ

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *