দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী বিমানে মাঝ আকাশে ককপিটের ভেতরেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ভোরে FZ1073 ফ্লাইটের এক পাইলট সহকর্মী পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়েছে। সংঘর্ষের জেরে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটি প্রায় ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে এবং সৌদি আরবের তাবুক শহরে জরুরি অবতরণে বাধ্য হয়। বিমানে থাকা ১৭৪ যাত্রীর সবাই নিরাপদে আছেন বলে ফ্লাইদুবাই নিশ্চিত করেছে।
মাঝ আকাশে যা ঘটেছিল
ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫ মিনিটে দুবাই থেকে রওনা হয়। প্রায় ৩৪,০০০ ফুট উচ্চতায় ওড়ার সময় ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। যাত্রীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এক ব্যক্তি ছুরি বের করে এক পাইলটকে মেঝেতে ফেলে দেন; চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষের মধ্যেই বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারাতে থাকে — প্রায় ৩৪,০০০ ফুট থেকে ১৬,০০০ ফুটের কাছাকাছি নেমে আসে। একপর্যায়ে বিমানের স্কোয়াক কোড বদলে জরুরি সংকেত (৭৭০০) এবং পরে হাইজ্যাকিং বা “বেআইনি হস্তক্ষেপের” সংকেত (৭৫০০) পাঠানো হয়। সৌদি আরবের আকাশসীমায় থাকতেই জরুরি সংকেত সক্রিয় হয়, এরপর বিমানটি তাবুকের প্রিন্স সুলতান বিন আবদুল আজিজ বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ছবিতে বিমানের লেজের রাডারের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দেখা গেছে; ইসরায়েলের এক সাবেক ফ্লাইট-নিরাপত্তা কর্মকর্তার মতে, দ্রুত উচ্চতা কমার ধাক্কাতেই এই ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে।
যাত্রী ও ক্রুদের তৎপরতায় বড় বিপদ এড়ানো
যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কেবিন ক্রু ও কয়েকজন যাত্রী এগিয়ে এসে হামলাকারীকে দমন করেন। দুজন অফ-ডিউটি রিলিফ পাইলট — যারা পরের ফ্লাইটের দায়িত্বে ছিলেন — বিমানটি স্থিতিশীল করে নিরাপদে অবতরণ করান। দুই পাইলটই সংঘর্ষে আহত হয়েছেন।
এক যাত্রী বলেন, “আমরা হয় বিধ্বস্ত হতাম, নয়তো খুন হতাম।” আরেক যাত্রী রক্তাক্ত অবস্থায় সাহায্য চেয়ে বলছিলেন, “এই মুহূর্তে আমরা সন্ত্রাসীদের দমন করেছি।”
হামলাকারী সম্পর্কে যা জানা গেছে
জেরুজালেম পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন হামলাকারী ওমানের নাগরিক এবং প্রায় এক বছর ধরে ফ্লাইদুবাইয়ে কর্মরত ছিলেন — তবে তার পরিচয় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে এক কর্মকর্তা বলেন, “এক পাইলট অন্যজনকে ছুরিকাঘাত করে ৯/১১-এর মতো ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করেছিল।” কোনো বিদেশি সরকার বা সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ এখনও মেলেনি বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর ইসরায়েলি বিমানবাহিনী সতর্কতামূলকভাবে যুদ্ধবিমান পাঠায় এবং দেশের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়; পরে তা খুলে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। তার দপ্তর জানিয়েছে, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে, ইসরায়েলি যাত্রীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
তবে ঘটনার চরিত্র নিয়ে বক্তব্যে ভিন্নতা আছে। নেতানিয়াহুর এক মুখপাত্র বলেন, এটি হাইজ্যাকিং ছিল বলে মনে হয় না। অন্যদিকে IDF, মোসাদ ও শিন বেতসহ ইসরায়েলের নিরাপত্তা মহলের ক্রমবর্ধমান মূল্যায়ন — এটি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা ছিল। কট্টরপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির একে সরাসরি “সন্ত্রাসী হামলা” বললেও তদন্তকারীরা এখনও তা নিশ্চিত করেননি।
এখন কী হবে
ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, যাত্রীদের তেল আবিবে পৌঁছে দিতে সৌদি আরবে বিকল্প বিমান পাঠানো হচ্ছে। সৌদি আরবে ইসরায়েলিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় আটকে পড়া যাত্রীদের ফেরানো কূটনৈতিকভাবেও স্পর্শকাতর বিষয়; ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী সামরিক বিমান পাঠানোর সুপারিশ করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ঘটনার তদন্ত চলছে এবং বিস্তারিত তথ্য এখনও আসছে।
আরও পড়ুন
বাগদাদ থেকে সেনা প্রত্যাহার: পশ্চিম এশিয়ায় শক্তির নতুন সমীকরণ


Leave a Reply